চীন-তাইওয়ান সংকট; কেন এবং বর্তমান গতিপথ কোন দিকে বা পরিস্থিতি কী?

 চীন-তাইওয়ান সংকট; কেন এবং বর্তমান গতিপথ কোন দিকে বা পরিস্থিতি কী?


সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান সংকট আবারও দৃশ্যমান হয়েছে এবং উত্তেজনা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের দ্বন্দ্ব এবং দুই দেশকেই হুঁশিয়ার করতে দেখা গেছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং বাইডেন কে এক ফোনালাপে বলেছে - আগুন নিয়ে খেললে পুড়তে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইউক্রেন যেমন গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাইওয়ান। ইতোমধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান এবং রাশিয়াকে ইউক্রেনে যুদ্ধে ব্যস্ত রাখা হয়েছে। রাশিয়া কে সহযোগিতা করছে চীন এবং দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখা গেছে। পশ্চিমাদের একযোগে মোকাবিলা করার কথা বলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ জি-৭ ভুক্ত দেশগুলো সহযোগিতা করে যাচ্ছে রাশিয়া কে পরাজিত করার জন্য, পশ্চিমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে এমনটাও বলা হয়েছে। ইউক্রেনের মতো ছোট এবং রাশিয়ার থেকে কম সামরিক শক্তিধর রাষ্ট্র কে পরাজিত করতে বেগ পেতে হচ্ছে রাশিয়াকে কেননা ইউক্রেন সাপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে। আবার পশ্চিমা সহযোগিতা পেয়েও রাশিয়ার সাথে পেরে উঠছে না ইউক্রেন কেননা চীনের মতো বৃহৎ শক্তি রাশিয়ার সাথে রয়েছে এবং সহযোগিতা করে যাচ্ছে। রাশিয়া কে ব্যস্ত রাখা হয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধে এবং যুদ্ধাবস্থায় এ দেশের অর্থনীতির গতি থমকে যাবে বা গতিপ্রকৃতি বদলে যাবে এজন্যই আমেরিকার এ কৌশল। কিন্তু রাশিয়া ছাড়াও বর্তমানে অন্যতম একটা চ্যালেঞ্জ চীন যারা দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে এবং ধারণা করা হচ্ছে বিশ্বের এক নাম্বার অর্থনীতির দেশ হবে। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এখন বড় মাথাব্যথা চীন কে হটানো বা এদের গতি রোধ করা। এজন্য কোয়াড,আই২ইউ২ জোট গঠন করতে দেখা গেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নজর এশিয়া তথা দক্ষিণ এশিয়ার দিকে। অর্থাৎ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে নজরদারি বেড়েছে। চীন এবং তাইওয়ান সংকট অনেক পুরনো ঘটনা। চীন বিভিন্ন সময়ে তাইওয়ানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে। চীন চায় তাইওয়ান কে তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে কিন্তু তাইওয়ানের প্রায় ৯৫ ভাগ জনগণ তা চায় না, তারা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং চীন থেকে আলাদা হতে চায়। কিন্তু চীন তা কখনো হতে দিতে পারে না। চীন দক্ষিণ চীন সাগর ব্যবহার করে মূলত তাদের বাণিজ্য করে থাকে এবং বাণিজ্যিকভাবে অগ্রগতি সাধন করে চলছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আমেরিকা ব্যস্ত বা ঐদিকে নজর এমন সুযোগে চীন পুরো তাইওয়ান দখলে নিতে পারে এমনটা বলা হচ্ছে। যেকোনো সময় চীনা সেনা সদস্য তাইওয়ানে প্রবেশ করতে পারে এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এরকম অবস্থায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে তাইওয়ান সহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাইওয়ান ছোট একটি দ্বীপ যা দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত এবং এদের স্বাধীন হতে বিভিন্ন উস্কে দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সহযোগিতা করা হবে এমনটা বলা হচ্ছে। 


কেন এই সংকট? 


চীন মূলত দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত একটা দ্বীপ রাষ্ট্র। ১৬৮৩-১৮৯৫ সাল পর্যন্ত চীনের রাজারা এই দেশ শাসন করতো। পরবর্তী তে জাপানিরা এ দ্বীপ দখল করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে চীনা চিয়াং কাই শেকের নেতৃত্বাধীন চীনা সরকারের হাতে চলে যায় তাইওয়ান অর্থাৎ জাপানিদের হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে। পরবর্তী তে ১৯৪৯ সালে মাও সে তুং এর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি বিজয় লাভ করলে বিরোধী দল তাইওয়ান দ্বীপে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং তাইওয়ানের অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে যায়। চীন মূলত তাইওয়ান কে তাদের অংশ হিসেবে মনে করে কিন্তু তাইওয়ানের বসবাসকারী লোকজন স্বাধীন হতে চায় এবং একটা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু চীন চায় না তাইওয়ান স্বাধীন রাষ্ট্র হোক, তারা চায় চীন তাদের অধীনে থাক তবে চীনের ভূখণ্ডের মধ্যে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে তাদের পরিচিতি থাকবে। বিভিন্ন সময়ে তাইওয়ান স্বাধীন হতে চাইলে তা রোধ করে চীন। তাইওয়ানের জাতিসংঘে সদস্য পদ পেতে চীন ভেটো দেয়, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না পায় এজন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাইওয়ান যদি আলাদা হয়ে নতুন একটি রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয় তবে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আধিপত্য কমে যাবে এবং নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে। চীনের ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে এই সাগর এবং বাণিজ্য পথ সুগম করেছে। চীনের সাথে তুলনা করলে জনসংখ্যা প্রায় ২ শতাংশের মতো এবং আয়তন ১৩,৮,২৬ বর্গমাইল। কিন্তু তবুও চীনের কাছে এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে চীনের উদীয়মান গতি ঠেকাতে যদি তাইওয়ান কে স্বাধীন রাষ্ট্র করা যায় তাহলে চীনের বাণিজ্যে ভাটা দেখা যাবে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। অবশ্য আমেরিকা চায় চীন পিছিয়ে থাক বা কখনো তাদের ছাড়িয়ে না যায়।


সংকটের বর্তমান গতিপথ কোনদিকে বা পরিস্থিতি কী?


রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে ধারণা করা হচ্ছে চীন প্রস্তুতি নিচ্ছে তাইওয়ান দখলের জন্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নজর এই যুদ্ধের দিকে এমনটা ভাবা হচ্ছে। জানা গেছে, আগামী আগস্ট মাসে মার্কিন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফর করবেন। তাইওয়ানের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক যেন দিন দিন বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন গত এক বছরে অন্তত তিন বার বলেছে তাইওয়ান আক্রান্ত হলে আমেরিকা সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধা করবে না। এবারের ন্যান্সি পেলোসির সফরের কথা চীনের জন্য একটু বেশি উদ্বেগের। ন্যান্সি পেলোসি হলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি, যার অবস্থান প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের পরেই। পেলোসি মার্কিন নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার। ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফর নিয়ে চীন সামরিক ব্যবস্থার হুমকি দিচ্ছে। চীনা সরকারি কর্মকর্তারা আমেরিকানদের সতর্ক করেছেন যে এই সফর চীনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের সামিল এবং এতে প্রমাণ হবে যে আমেরিকা তাদের 'এক চীন' নীতি বর্জন করেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে - সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় শক্ত ব্যবস্থা নেবে চীন। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন - চীনা সামরিক বিমান স্পিকার পেলোসিকে বহন করা বিমানকে এসকর্ট করে অর্থাৎ ঘিরে তাইওয়ানের আকাশ সীমায় চলে যেতে পারে যাতে তিনি তাইপেতে অবতরণ করতে না পারেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেও দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক প্রস্তুতি নিতে শোনা যাচ্ছে। এ অবস্থায় দুই দেশের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধ এবং নতুন একটা সংকট তৈরি হয় কিনা এমনটা সময়ের ব্যাপার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মাশুল ইতোমধ্যে দিয়ে যাচ্ছে পুরো বিশ্ব, বিশ্ব বাজারে মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি তেলের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। চীন ধারণা করছে এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি সফরের মধ্য দিয়ে হয়তো তাইওয়ান কে উস্কে দিয়ে নতুন একটা যুদ্ধের সৃষ্টি করবে। আর অন্যান্য সময়ের তুলনায় এবার ন্যান্সি পেলোসির সফরে বেশি উদ্বিগ্ন চীন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে চীনের রাশিয়াকে সাহায্য এবং উদীয়মান অর্থনীতির গতিপথ থমকে দিতে এখানে নতুন একটা যুদ্ধের দামামা বাজাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। একদিকে রাশিয়াকে যুদ্ধের মাধ্যমে ব্যস্ত রেখেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ চীন কে যুদ্ধের মধ্যে ব্যস্ত রাখতে হতে পারে ন্যান্সি পেলোসির এই সফর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখনো পুরো তাইওয়ান চীনের অধীনে যাক এবং চীন দক্ষিণ চীন সাগরে একক আধিপত্য করুক এমনটা হতে দিতে পারে না। তাহলে ইলেকট্রনিক এবং মাইক্রোচিপ মার্কেট পুরোপুরি চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে এবং একচেটিয়া বাণিজ্যের সুযোগ পাবে যা অর্থনীতি আরও গতিশীল করবে। এছাড়া, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে ভালো সম্পর্কের কারণে মার্কিন যে পেট্রোল ভেসেল এই অঞ্চলে রয়েছে তা বিতাড়িত হতে পারে যদি তাইওয়ান পুরোপুরি চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাইওয়ানে কি যুদ্ধবস্থা তৈরি হবে এবং চীন কে কি ফাঁদে ফেলা হবে কিনা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে যাতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমনটাই এখন দেখার বিষয়।


✍️ মোঃ আসাদুল আমীন 

শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url