ডলারের সঙ্কট নিরসনে করণীয়

 ডলারের সঙ্কট নিরসনে করণীয়

নিরঞ্জন রায়


বেশ কিছুদিন হলো বিশ্বের অনেক দেশের মতোই আমাদের দেশেরও বৈদেশিক মুদ্রা বিশেষ করে মার্কিন ডলারের বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। ডলারের লেনদেনের ক্ষেত্রে এ রকম সাময়িক অস্থিরতা খুব স্বাভাবিক ঘটনা এবং এতে বিচলিত হওয়ার কোন কারণ নেই। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সমগ্র বিশ্বেই এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর ওপর শ্রীলঙ্কার ঘটনা কিছুটা হলেও সুপ্ত আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। এসব কারণেও এবার ডলার লেনদেনে অস্থিরতা একটু ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এই অবস্থা সামাল দিতে বা আগে থেকেই সামলে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে মুদ্রাবাজারের অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- (১) এলসির মার্জিন বৃদ্ধি

, (২) রেমিটেন্স প্রেরণের শর্ত শিথিল করা, 

৩) রেমিটেন্সের ওপর প্রণোদনা প্রদান, 

৪) বিদেশ ভ্রমণের ওপর অধিক মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, (৫) বৈদেশিক ব্যয়কে নিরুৎসাহিত করা এবং 

৬) প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বন ইত্যাদি। এসব পদক্ষেপ নিশ্চয়ই দেশে ডলারের চাহিদার ওপর চাপ লাঘব করবে এবং পাশাপাশি ডলার সরবরাহ বৃদ্ধি করবে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিশেষ করে ডলারের লেনদেনে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে বলে আশা করা যায়। তবে এসব পদক্ষেপের ফল পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত অনেক পদক্ষেপ দেশে ডলারের বাজারকে স্থিতিশীল করতে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হলেও এলসির মার্জিন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত যেভাবে নেয়া হয়েছে তা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে তা বলা মুশকিল


দেশে অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করতে বা প্রকারান্তরে ডলারের ওপর চাপ কমাতে এলসি খোলার ক্ষেত্রে মার্জিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তটি আপাতদৃষ্টিতে এলসি খোলাকে নিরুৎসাহিত করবে বা ডলারের ওপর চাপ কমাবে বলে প্রতীয়মান হলেও বাস্তবে তা নাও হতে পারে। বরং উল্টোটা অর্থাৎ ডলারের ওপর চাপ কমানোর পরিবর্তে বাড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের দেশে এলসি খোলার সময় নির্ধারিত হারে মার্জিন রাখতে হয়। অর্থাৎ এলসি খোলার সময় এলসির পরিমাণের একটি নির্দিষ্ট অংশ আগে থেকেই ব্যাংকের হিসাবে জমা রাখতে হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- এই মার্জিনের টাকা জমা রাখা হয় স্থানীয় মুদ্রায় অর্থাৎ বাংলাদেশী টাকায়। আর এলসির অর্থ পরিশোধ করা হয় বৈদেশিক মুদ্রায় বা ডলারে। যে কেউ চাইলে বাংলাদেশী টাকায় মার্জিন জমা দিয়ে এলসি খুলতে পারে। কিন্তু কিছুদিন পরে যখন সেই এলসির ডকুমেন্ট চলে আসবে এবং এলসির বিপরীতে অর্থ ডলারে পরিশোধ করতে হবে তখন সেই মার্জিনের টাকা দিয়ে বাজার থেকে ডলার ক্রয় করে পরিশোধ করতে হবে। যেহেতু এলসির অর্থ পরিশোধ করার একটা নির্ধারিত সময় থাকে, তাই সেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডলার ক্রয় করার জন্য ব্যাংক মরিয়া হয়ে ওঠে। যা প্রকারান্তরে ডলারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। যেমন ধরা যাক, একজন আমদানিকারক দশ লাখ ডলারের একটি এলসি খুলবে। যার বিপরীতে নয় লাখ ডলারের সমপরিমাণ নয় কোটি টাকা জমা দিতে হবে। যখন এই এলসির অর্থ পরিশোধ করতে হবে তখন সেই নয় কোটি টাকা দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাজার থেকে ডলার ক্রয় করতে হবে। এই অবস্থা বাজারে ডলারের ওপর চাপ হ্রাসের পরিবর্তে আরও বাড়িয়ে দেবে। যা মূলত ডলারের বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।

এলসির মার্জিন বাড়িয়ে বাজারে ডলারের ওপর চাপ কমাতে হলে সিদ্ধান্তটি একটু সংশোধন করে ভিন্নভাবে নিতে হবে। যে কোন বিলাসবহুল পণ্য বা অত্যাবশ্যক নয় এমন পণ্যসামগ্রী আমদানির ক্ষেত্রে এলসির মার্জিন বৃদ্ধি করতে হবে এবং সেই মার্জিন জমা করতে হবে এলসির মুদ্রায়। অর্থাৎ যে মুদ্রায় এলসির অর্থ পরিশোধ করতে হবে সেই একই মুদ্রায় এলসির মার্জিন জমা করতে হবে। ইউএস ডলারে এলসি খুললে, অর্থাৎ ইউএস ডলারে এলসির অর্থ পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা থাকলে সেই এলসির বিপরীতে মার্জিনও জমা করতে হবে ইউএস ডলারে। এতে সুবিধা হচ্ছে এলসি খোলার আগেই ডলারের ব্যবস্থা করে নিতে হবে। এভাবে ডলারে এলসির মার্জিন জমা করার ফলে এলসি খুলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এলসির অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতায় পরে হন্যে হয়ে ডলার সংগ্রহের কারণে বাজারে ডলারের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি হবে না। আলোচ্য উদাহরণের ক্ষেত্রে কোন আমদানিকারককে দশ লাখ ডলারের এলসি খুলতে হলে তাকে আগেই বাজার থেকে নয় লাখ ডলার ক্রয় বা সংগ্রহ করে মার্জিন হিসেবে জমা দিতে হবে। যদি সুবিধাজনক দামে এই নয় লাখ ডলার বাজার থেকে ক্রয় বা সংগ্রহ করতে পারে তবেই সে এই এলসি খুলতে পারবে, নচেৎ নয়। এই ধরনের মার্জিন প্রদানের কারণে এলসি খোলার আগেই ডলারের বিষয়টি সুরাহা হয়ে যায়। টাকায় মার্জিন দিয়ে এলসি খুলে এলসির অর্থ পরিশোধের বিপদে পরে যে কোন মূল্যে ডলার ক্রয় বা সংগ্রহ করার প্রবণতাই বাজারে ডলারের ওপর অহেতুক চাপ সৃষ্টি করে। যা মূলত ডলার সঙ্কট আরও বাড়িয়ে দেয়। একারণেই এলসির মার্জিন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি একটু সংশোধন করে এলসির মুদ্রায় বা ডলারে সংরক্ষণের বিষয়টি কার্যকর করার নির্দেশ দেয়া প্রয়োজন।


বিদেশ থেকে ডলার বা রেমিটেন্স প্রেরণের শর্ত শিথিল করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে ডলার প্রেরণের সুযোগ অবারিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে রেমিটেন্স প্রেরণের শর্ত শিথিল দেশে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে কতটা সহায়ক হবে, তা বলা মুশকিল। আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোর উন্নত বিশ্বের ব্যাংকের সঙ্গে করসপনডেন্ট রিলেশনশিপ বাতিল হতে হতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। আমেরিকা, কানাডা এবং ইউরোপের অধিকাংশ ব্যাংক আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে করসপনডেন্ট রিলেশনশিপ বাতিল করে দিয়েছে। ফলে এখানকার ব্যাংক থেকে সরাসরি ডলার দেশে পাঠানো যায় না। ডলার পাঠাতে গেলে একাধিক ব্যাংক হয়ে যেতে হয়। আর প্রত্যেক মধ্যস্থতাকারী ব্যাংক প্রতি রেমিটেন্সের জন্য পৃথক পৃথক ফি চার্জ করে। ফলে রেমিটেন্স খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যায় এবং প্রবাসীরা ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ প্রেরণে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। কিছুদিন আগে আমার এক পরিচিত ব্যক্তি আমেরিকা থেকে মাত্র ছয় হাজার ডলার পাঠাতে দুই শত ডলারের বেশি রেমিটেন্স ফি দিয়েছে। কারণ, সে জেপি মরগানচেজ ব্যাংকের মাধ্যমে ডলার পাঠিয়েছে। অথচ জেপি মরগানচেজ ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংকের করসপনডেন্ট রিলেশনশিপ না থাকায় তাকে আরেকটি মধ্যস্থতাকারী ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক হয়ে যেতে হয়েছে এবং এই দুই বিদেশী ব্যাংকই পৃথক পৃথকভাবে রেমিটেন্স ফি চার্জ করেছে। অথচ জেপি মরগানচেজ বা আমেরিকার অন্য কোন ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংকের সরাসরি করসপনডেন্ট রিলেশনশিপ থাকলে মাত্র আশি ডলার রেমিটেন্স ফি দিয়েই এই অর্থ প্রেরণ করা সম্ভব ছিল। এই ধরনের অতিরিক্ত রেমিটেন্স ফি দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে সরাসরি ডলার প্রেরণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায়। আমাদের কথায় বাংলাদেশ ব্যাংক অবাক হতে পারে। তারা যদি প্রত্যেক ব্যাংককে তাদের একটিভ করসপনডেন্ট ব্যাংকের তালিকা দিতে বলে, তাহলে খুব সহজেই তারা এই বক্তব্যের সত্যতা খুঁজে পাবে।


আমাদের দেশে রেমিটেন্স প্রেরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিবর্তে বিভিন্ন মানি ট্রান্সফার এজেন্সির ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে অধিকাংশ মানি ট্রান্সফার এজেন্সির কাছে ব্যাংকিং চ্যানেল এবং হুন্ডিÑদুটো পথই খোলা থাকে। এজেন্টকেও সরাসরি ডলার পাঠাতে গেলে তাদেরকে কোন না কোন ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে। বর্তমানে কঠোর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের কারণে মানি ট্রান্সফার এজেন্টরা এক ধরনের প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয়। ফলে তারা সঙ্গত কারণেই প্রবাসীদের নন ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণে উৎসাহিত করে থাকে। যা দেশে সরাসরি ডলার প্রেরণের পরিমাণ যথেষ্ট হ্রাস করে। আমরা এই ব্যবস্থার অনেক সমালোচনা করতে পারি, কিন্তু এটাই বর্তমান বাস্তবতা। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ প্রেরণের সুযোগ অবারিত করতে হবে। আর এটি করতে হলে আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোর উন্নত বিশ্বের বিশেষ করে আমেরিকা, কানাডা এবং ইউরোপের ব্যাংকের সঙ্গে করসপনডেন্ট রিলেশনশিপ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং করসপনডেন্ট ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। এই করসপনডেন্ট রিলেশনশিপের অভাবে যে শুধুমাত্র সরাসরি ডলার প্রেরণে সমস্যা হয় তাই নয়, অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও মারাত্মক সমস্যা হয়। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখে এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে জরুরী নির্দেশ প্রদান করা।


।।

লেখক : ব্যাংকার, টরেন্টো, কানাডা

[email protected]

জনকণ্ঠ,২১ জুলাই

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url