সৌদি আরব সফর করলেন জো বাইডেন; কেন এবং কী আলোচনা হলো বা কী পেলেন বাইডেন?

 সৌদি আরব সফর করলেন জো বাইডেন; কেন এবং কী আলোচনা হলো বা কী পেলেন বাইডেন? 


সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক একসময় অনেকটা ভালো ছিল। সৌদি আরব কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে পরামর্শ বা আলোচনা করে নিতো। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ভাটা লাগে এবং পরবর্তী তে সম্পর্কের চরম অবনতি হয়। ২০১৮ সালে সৌদি বংশোদ্ভূত সাংবাদিক জামাল খাসোগি কে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে হত্যা করা হয়। সাংবাদিক জামাল খাসোগি সৌদি যুবরাজের বিভিন্ন সমালোচনা করতেন ওয়াশিংটন পোস্টে বিভিন্ন কলাম লিখে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় বাইডেন প্রচারকালে সৌদি সরকারের সমালোচনা করে এবং মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে। আর এই হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী করা হয় সৌদি যুবরাজ কে। বলা হয় সৌদি যুবরাজ এর সাথে জড়িত এবং মার্কিন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এ তথ্য নিশ্চিত করে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই সৌদি আরব সরকারের সমালোচনা এবং সৌদি কে একঘরে করে রাখার কথা বলে। সৌদি যুবরাজের বিচার করা হবে এমন ইঙ্গিত দেয় প্রেসিডেন্ট বাইডেন যা সৌদি সরকারের মনঃক্ষুণ্ন করে এবং সম্পর্কের অবনতি হয়। এছাড়া, ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের দমনের জন্য সৌদি আরব বিভিন্ন সময়ে আক্রমণ চালিয়েছে এবং সৌদি আরব কে যুক্তরাষ্ট্র এবিষয়ে সহযোগিতা করবে এমনটা প্রত্যাশা করেছিল সৌদি আরব। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সন্ত্রাসী হিসেবে অ্যাখ্যা দিবে এমনটা আশা করেছিল সৌদি কেননা দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এ ধরনের কোন কিছু করতে দেখা যায়নি। তাই সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের চরম অবনতি হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে পর বিভিন্ন বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং এর ফলে বিশ্বে একটা সংকটাবস্থা তৈরি হয়। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পায় বিশ্ব বাজারে, প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ কমে যায়। এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সৌদি আরব কে আহ্বান করে তেল উত্তোলন বৃদ্ধি করে সংকট মোকাবিলা বা ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতা করার জন্য। কিন্তু সৌদি আরব কে বাইডেনের ডাকে সাড়া দিতে দেখা যায়নি এবং তখনই সম্পর্কের অবনতির বিষয় চোখে পড়ে, আন্তর্জাতিক মহলে ছড়িয়ে পড়ে। 


কেন বাইডেন সৌদি আরব সফর করেন?


প্রেসিডেন্ট বাইডেন সৌদি আরব সফর করেন মূলত জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলা করার জন্য। দুই দেশের মধ্যে যে সম্পর্কে ভাটা তা দূর করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে পশ্চিমা বিশ্ব বিভিন্ন বিষয়ে এক হয় এবং রাশিয়া কে অর্থনৈতিক চাপে ফেলতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞার ফলে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয় এবং বিশ্ব বাজারে দাম অনেক বেড়ে যায়। রাশিয়া সহ ইরান, ভেনিজুয়েলা এসব দেশের উপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। তাই জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলা করার জন্য মধ্যপ্রাচ্য একমাত্র উপায় এবং এই সংকট দূর করতে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো ভূমিকা রাখবে পারে। এছাড়া সৌদি আরব সরকারের সাথে সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছে তা দূর করতে বা সম্পর্কের উন্নতির জন্য সৌদি আরব সফর করেন বাইডেন। যদিও বলা হয়েছিল বাইডেন সৌদি যুবরাজের সাথে সাক্ষাৎ করবেন না, তিনি শুধু জিসিসি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য যাবেন। কিন্তু বাইডেন সৌদি যুবরাজের সাথে সাক্ষাৎ এবং আলোচনা করেন যা আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়েছে। সৌদি আরবের সাথে বিশ্বাসঘাতকের পরিচয় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এমনটা বলেছেন অনেক বিশ্ব নেতারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের রয়েছে চরম দ্বন্দ্ব এবং এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ভালো নেই। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি এবং তা ভঙ্গ করতে দেখা গেছে। ইরান কে মোকাবিলা করার জন্য সৌদি আরব সফর এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের মাধ্যমে একযোগে ইরান কে মোকাবিলা করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ইরান কে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের হুমকি মনে করে যুক্তরাষ্ট্র। এই অঞ্চলে ইরান প্রভাব বিস্তার করবে এমনটা আমেরিকা চান না। এছাড়া, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ইসরায়েলের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্থাপন। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক গড়তে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এজন্য সৌদি আরব সফর করেন বাইডেন এমনটা ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে ইসরায়েল শান্তি স্থাপন করেছে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র ভূমি সৌদি আরব কে এই প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসার গুরুত্ব অনেক। যুক্তরাষ্ট্র চায় তাদেন যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফোকাস কমিয়ে এশিয়া তথা দক্ষিণ এশিয়ার দিকে ফোকাস বাড়িয়েছে। চীন কে আমেরিকা বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে কেননা চীনের অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।


ধারণা করা হচ্ছে, চীন খুব শীগ্রই আমেরিকা কে টপকাবে এবং এক নম্বর অর্থনীতির দেশ হবে। চীন ঠেকাতে আমেরিকা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং আমেরিকা কে বিভিন্ন জোর গঠন করতে দেখা গেছে। কোয়াড জোট এবং সর্বশেষ আই২ইউ২ নামক জোট গঠন করতে দেখা গেছে। এই আই২ইউ২ জোটে রয়েছে ইসরায়েল এবং বলা হচ্ছে ইসরায়েল কে আমেরিকা ফোকাসে নিয়ে আসছে, তাদের জোটে রাখছে। যেন ইসরায়েল কে বিশ্বের কাছে পরিচিত করার চেষ্টা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্থাপনের মধ্যে দিয়ে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল ইসরায়েল কে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এমনটা ধারণা করা হচ্ছে। 


কী আলোচনা হলো বা কী পেলেন বাইডেন? 


বাইডেনের সৌদি সফরে জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলা করার জন্য আলোচনা হয়েছে এবং সৌদি আরব কে অনুরোধ করা হয়েছে। যু্ক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার কথা ব্যক্ত করেছে। সৌদি আরব সফরে সৌদি যুবরাজের সাথে সাক্ষাৎ করবে না এমনটা কথা থাকলেও সাক্ষাৎ করেছে এবং সমালোচিত হয়েছে। সৌদি সফর দুই দেশের পুরনো সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি দেখা গেছে। সৌদি আরব সফরের মধ্য দিয়ে জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় কোন প্রতিশ্রুতি দেয়নি সৌদি আরব। বলা হয়েছে দৈনিক ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলনের সক্ষমতা রয়েছে সৌদি আরবের। সৌদি সফরের মধ্য দিয়ে ইসরায়েল সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে এমনটা জানা যায়। এবং ধারণা করা হচ্ছে আকাশসীমা ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হবে। কিন্তু সৌদি আরব এখনই ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কের উন্নতি হোক এমনটা চাচ্ছে না কেননা ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের আগ্রাসন বা আক্রমণ কে মুসলিম বিশ্বের পবিত্র দেশ সমর্থন করে না। ইসরায়েল কে বিভিন্ন সময়ে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। এদের বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করে থাকে এবং আক্রমণ বা আগ্রাসন চালাতে সহায়ক হয়। সৌদি আরব ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন জরুরি যদি এ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ইরান কে মোকাবিলা করতে হয়। জিসিসি সম্মেলনে জিসিসির সদস্য দেশগুলো এবং আরও তিন দেশ অংশ নেয়। এখানে তেল সংকটের বিষয়ে আলোচনা হলে কোন প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। সৌদি আরব বলেছে, সামনের মাসগুলোকে কি হবে তা দেখার অপেক্ষায় সৌদি আরব, তবে কোন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। এছাড়া ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কের উন্নতি তে এখনই রাজি নয় সৌদি আরব। তাই বলা যায়, বাইডেনের সৌদি সফরে রয়েছে শূন্যতা, কোন কিছু পাওয়া যায়নি বা কোন ফল আসেনি। ধারণা করা হচ্ছে, সৌদি আরব হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের উন্নতি হোক এমনটা চাচ্ছে না। 


✍️ মোঃ আসাদুল আমীন 

শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url