ডমিনো ইফেক্ট এবং দেশের বর্তমান অর্থনীতি

 ডমিনো ইফেক্ট এবং দেশের বর্তমান অর্থনীতি

======================

ডমিনো ইফেক্ট হচ্ছে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকা একটি প্রভাব; অর্থাৎ একই শিকলে বা চেইনের মধ্যে অবস্থানকালে একটি ঘটনা একদম একই রূপ অন্য ঘটনার সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে সব ঘটনাই একটি শৃঙ্খলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, অনেক তাস যদি দাঁড় করিয়ে রাখা যায়, একটিকে টোকা দিয়ে ফেলে দিলে এক এক করে পাশের তাসগুলোও পড়ে যাবে-এটি হচ্ছে ডমিনো তত্ত্বের মূল কথা। এটিকে চলন্ত ঘটনাগুলোর একটা সিরিজ বা পর্যায়ক্রম বলা যেতে পারে, যেখানে প্রতিটি ঘটনা ঘটনের সময়ের ব্যবধান খুবই স্বল্প।


বিশ্বরাজনীতি বা অর্থনীতিতে নানা ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে ডমিনো ইফেক্ট কাজ করে। ডমিনো ইফেক্টে খুব ছোট একটি ঘটনা বা একাধিক ঘটনা উদ্দীপিত হয়ে অন্য ঘটনাগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে একটি চেইন তৈরি করে, যার ফলে বৃহৎ একটি ঘটনা ঘটে যেতে পারে। ঠিক যেমনটা বাটার ফ্লাই ইফেক্ট অনুযায়ী, ব্রাজিলে একটি প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর কারণে সৃষ্ট তরঙ্গ থেকে টেক্সাসে টর্নেডো হতে পারে, অনেকটা সেরকম। বিশ্বরাজনীতিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করতে গেলেই সেখানে ডমিনো ইফেক্ট খুঁজে পাওয়া যাবে; যেমন প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিংবা অতি সাম্প্রতিক সময়ে আরববসন্ত। অর্থনীতির উত্থান-পতনও ডমিনো ইফেক্টের মতো একই শিকলে থাকা বিভিন্ন বিষয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।


এবার আসা যাক বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির দিকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের জিডিপি, মাথাপিছু আয়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সর্বোপরি অর্থনীতির আকার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে বৈদেশিক ঋণ, দুর্নীতি আর বিদেশে অর্থ পাচার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বার্ষিক নিট বিদেশি ঋণ গ্রহণের (গৃহীত ঋণ থেকে পরিশোধ বাদ দিয়ে) পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২০ গুণ বেড়ে যা প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ২০ গুণ বাড়লেও পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে মাত্র দ্বিগুণ। অর্থাৎ প্রতিবছর বিশাল অঙ্কের ঋণের বোঝা দেশের অর্থনীতির ওপর চাপছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে।


পরিশোধের সময়ের সঙ্গে যুক্ত হবে সুদ। যেহেতু গত অর্থবছর পর্যন্ত অধিকাংশ মেগা প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়নি, তাই এ বোঝা বহন করতে আমাদের অর্থনীতিকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু আগামী অর্থবছর থেকে এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই কোনো কোনো বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। শুধু রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পেই ২০২৩ সাল থেকে বছরে ৫৬৫ মিলিয়ন ডলার কেবল সুদ (মূল ঋণ বাদে) দিতে হবে। আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে প্রায় সব বৃহৎ প্রকল্পে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে; যার উদ্বেগজনক প্রভাব পড়বে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।


এবার একটু আমাদের বর্তমান রিজার্ভের দিকে নজর দেওয়া যাক। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানির ১ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের পর রিজার্ভ ৩৯ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। একদিনের ব্যবধানে তা আরও কমে ৩৯ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি সরকারের হিসাব। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলে (ইডিএফ) বিনিয়োগ করা সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার বাদ দিলে এ অঙ্কটা দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার, যা আমাদের বর্তমান রিজার্ভের প্রায় সমান। গত বছর ৮ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সাহায্য না এলে পরিস্থিতি অনেক খারাপ হতো। এটাই আমাদের রিজার্ভ এবং টাকার মানকে এখনো টিকিয়ে রেখেছে।


বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট কাটাতে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তার জন্য আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার। এ ঋণ পাওয়া গেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান নয়। এ ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। কেননা শেষবার যখন আইএমএফ একটি ঋণের প্রস্তাব দিয়েছিল, তাতে করবিহীন অর্থকে বৈধ করার শর্তহীন সুযোগ বাতিল করা, বৈদেশিক মুদ্রানীতি শিথিল করা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কমানোসহ ৩৩টি শর্ত দিয়েছিল, যা সেসময় সরকার মানতে পারেনি। এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে শীতল সম্পর্কের কারণে চলতি অর্থবছরে বড় ধরনের বৈদেশিক সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ইতোমধ্যে সরকার বিলাসী পণ্য আমদানিতে নানা রকম বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ডলার সংকটের কারণে বিলাসী পণ্য তো দূরের কথা, অতি প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্যও ঋণপত্র খুলতে পারছে না ব্যাংকগুলো। জ্বালানির সংকট মূলত সেখান থেকেই।


আর এ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকার ঘোষণা দিয়ে লোডশেডিং করতে বাধ্য হয়েছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এখন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। অথচ মাত্র চার মাস আগে গত ২১ মার্চ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আতশবাজি, লেজার শোর মাধ্যমে শতভাগ বিদ্যুতায়ন উদ্যাপন করা হয়। রেন্টাল, কুইক রেন্টাল, বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানীকৃত তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এবং সরকারি বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালনে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।


দুই মাসের ব্যবধানে ১৩ দফায় ৭.৭৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে ডলারের দাম। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলার কিনতে খরচ করতে হচ্ছে ৯৩.৯৫ টাকা। ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের কাছে বিক্রি করছে ৯৮-৯৯ টাকা দরে। কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাসী আয় কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। ব্যাংক এবং খোলাবাজারে ডলারের বিনিময় হারের ব্যবধান বেশি হওয়ায় ইনফরমাল (অবৈধ) চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসার সম্ভাবনা বাড়ছে। এতে সামনের দিনগুলোয় বৈধপথে বৈদেশিক মুদ্রা আসার পরিমাণ কমে যাবে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। গত বছরের তুলনায় রপ্তানি আয় কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও তা ডলারের সংকট মেটাতে পারছে না। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর এবং এর সিংহভাগ আসে চীন থেকে। আমদানিতে বিভিন্ন রকম বিধিনিষেধ আরোপ এবং ডলারের দাম উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় কাঁচামাল আমদানিতে খরচ বৃদ্ধি পাবে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে চীন থেকে আমদানীকৃত কাঁচামাল দ্বারা উৎপাদিত পণ্য যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মিত্র ইউরোপের দেশগুলোয়ও রপ্তানি করা যাবে না। অথচ আমাদের মোট পোশাক রপ্তানির ৭৪ শতাংশের বাজার যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলো। ফলে সামনের দিনগুলোয় রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


প্রতিনিয়ত বাড়ছে ডলারের দাম। এজন্য ২০২১-২২ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে রেকর্ড ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার ছেড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যে প্রচেষ্টা চলতি অর্থবছরেও অব্যাহত আছে। আর এ কারণে রিজার্ভ সংকট আরও তীব্রতর হচ্ছে। টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। টাকার মানের অবমূল্যায়নের কারণে ইতোমধ্যে শেয়ারবাজার থেকে ছয় হাজার কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ উঠিয়ে নিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। অব্যাহত মূল্যস্ফীতির কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। এসবের পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত পাচার হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পরিমাণ বছরে গড়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা।


একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, সংকটগুলো একটা আরেকটার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং পর্যায়ক্রমে অপেক্ষাকৃত কঠিনভাবে আমাদের সামনে আসছে। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, খুব শিগগিরই এ সংকট কাটবে না বরং আগামী বছরগুলোয় তা আরও তীব্রতর হবে। পর্যায়ক্রমে তীব্র হয়ে ওঠা সংকটগুলো কি ডমিনো ইফেক্টের মতো কোনো মহাবিপর্যয়ের প্রারম্ভিক সূচনা; কোনো তাসে টোকা লাগেনি তো?


সাকিব আনোয়ার : অ্যাক্টিভিস্ট, প্রাবন্ধিক যুগান্তর

১৯ জুলাই ২০২২|যুগান্তর

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url